Dec 25

অদ্ভুত সেই রাতে

জ্যোৎস্নাত রাতে ঘুম জড়ানো চোখে বাড়ি ফিরছিলাম। সারাদিন এর ব্যাস্ততায় অনেক ক্লান্ত আর অবশাদ এ ভরা আমার মন। পা যেন আর চলছে না। আর একটা লেন পার হলেই আমার বাড়ি। ঘুম জড়ানো চোখে আশে পাশের কিছুই যেন আমি দেখছি না। এত জোরে হাটছি, তবুও যেন পথ শেষ হচ্ছে না। মনে হল, কেউ একজন আমাকে পেছন থেকে ডাকছে। প্রথম ডাকে সাড়া দিলাম না। কারন ঘুরে যে তাকাব, তাও ইচ্ছে করছে না। দ্বিতীয়বারের ডাকে ঘুরে তাকালাম।

আমাকে বলল, শুনছেন, আপনাকে বলছি ! আপনি কি বাড়ি যাচ্ছেন ? চলুন আপনাকে পৌঁছে দেই।

আমি বললাম, কে আপনি ? আপনাকে তো আমি চিনলাম না ?

সে বললঃ আমি পথ হারানো ক্লান্ত পথিক এর পথের সাথী। পথ হারানো ক্লান্ত পথিককে বাড়ি পৌঁছে দেয়াই আমার কাজ।

আমি বললামঃ আমি পথ হারাব কেন ?  এই লেনটা পার হলেই আমার বাড়ি। আমি নিজেই চলে যেতে পারব।

সে বললঃ পারলে তো ভালই। যান…!

আমি বললামঃ আপনাকে তো আমি চিনলাম না ? আপনি আমার বাসা চিনবেন কি করে ? আপনি কে ?

সে বললঃ বললাম না, আমি পথ হারানো পথিকের পথের সাথি।

আমি বললামঃ এখন কয়টা বাজে বলতে পারেন ?

সে বললঃ তিনটা।

আমি বললামঃ তিনটা ! কিভাবে ?

আমার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, সত্যিই তিনটা বাজে। আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল। কারন আমি অফিস থেকে বারটার দিকে বেরিয়েছি। অফিস থেকে বাসার দূরত্ব মাত্র ২০ মিনিট। এতটা সময় কিভাবে গেল, ভেবে পেলাম না ! তাহলে কি আমি সত্যি সত্যিই পথ হারিয়েছি ? মুহূর্তের মধ্যেই চোখের ঘুম আর জড়তা কেটে গেল। আশেপাশে ভাল করে খেয়াল করে দেখলাম সত্যিই আমি একটা অন্য রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু পথটা আমার অনেক চেনা। কিন্তু মনে করতে পারছি না। তবে মনে হচ্ছে, অনেক বার এসছি এই রাস্তায়। লোকটির দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখি, সে আর কেউ নয়, আমাদেরই এলাকারএক বড় ভাই। তার নাম ছিল লিটন। আমার স্পষ্ট মনে আছে। স্কুল শেষ হলে প্রায় প্রতিদিন বিকালেই  ফুটবল খেলছি তার সাথে।

আমি বললামঃ আরে, আপনি লিটন ভাই না ? আমি রিমন। কত দিন পর দেখা, তাও এই ভাবে।ভাবতে অবাক লাগছে। কেমন আছেন ভাই ?

সে অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই চেনা তাকানো। ফুটবল মাঠে গোল খেলে, আমার দিকে ঠিক এমন ভাবেই তাকাতো। আমি আবার বললামঃ আমাকে চিনতে পারেন নাই, লিটন ভাই ?

বেশ কড়া চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি লিটন নই। পথ হারানো পথিককে পথ খুঁজে দেয়াই আমার কাজ।

আমি বললাম, দুষ্টামি বাদ দিন তো। আমি আপনাকে ঠিক চিনেছি। আপনি বললেই হবে ? এত দিন আপনার সাথে খেললাম, আর আপনাকে চিনব না। হয়ত অনেক দিন পর দেখা। তাই বলে কি এত সহজে ভুলে যাব।

সে বলল, দেখুন, আপনি ভুল করছেন। আমি লিটন নই। চলুন বাড়ি পৌঁছে দেই। ভোর হতে চলল।

আমি বললামঃ আচ্ছা বাদ দিন, এইটা কোন রাস্তা?

সে বললঃ আমি নাম জনি না, শুধু জনি আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে। আমাকে আর কোন প্রশ্ন করবেন না।

আমি বললাম, ঠিক আছে, বলুন কেমন আছেন ?

সে বলল, কোন কথা নয়। শুধু আমাকে অনুসরন করুন।

সে অনেক জোরে জোরে হাটতে শুরু করল। আমি তার পিছে হাটতে শুরু করলাম, ভাবলাম, এমন করছে কেন, লিটন ভাই। খেয়াল করে দেখলাম, একটা আলো আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোথা থেকে আসছে, বুঝতে পারলাম না। মনে হল আকাশ থেকে পড়ছে। আকাশের দিকে তাকালাম। মনে হল, ঠিক যেন চাঁদ থেকে আলোটা আমাদের উপরই পড়ছে। আর আলোর উৎস, ওই চাঁদটা অদ্ভুত রকমের সুন্দর। চোখ যেন ফেরাতে পারছি না। কতক্ষণ যে চাঁদ-এর দিকে তাকিয়ে হেঁটেছি, বলতে পারব না। ঘোর কাটতেই, সামনে তাকিয়ে দেখি লিটন ভাই নাই। পুরো রাস্তায় আমি একাই। সামনে, পিছে বা পাশে, কোথাও কেউ নাই।আমার গা শিউরে উঠল। মিষ্টি সেই আলোটাও নাই। আমার শরীর কেমন যেন ভারী হয়ে এল। বামে ঘুরতেই দেখলাম, আমার বাড়ির মেইন গেট। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, রাত চারটা বেজে ত্রিশমিনিট। মেইন গেটে তালা পড়ে গেছে। অনেক ডাকাডাকি করে, দারোয়ান কে দিয়ে গেট খোলালাম। দারোয়ান বলল, এত দেরি কেন স্যার। আমি কোন কথার উত্তর না দিয়ে, সোজা দরোজা খুলে ঘরে ঢুকে গেলাম। ঘরে ঢুকেই, টেবিল থেকে জগটা নিয়ে এক নিঃশ্বাসে প্রায় অর্ধেক জগ পানি খেয়ে, বেসিন এর সামনে গিয়ে চোখে-মুখে পানি দিলাম। চেয়ার টেনে বসে পড়লাম। চোখ বন্ধ করতেই মনে পড়ল, এই লিটন ভাই তো অনেক আগে, প্রায় ১০ বছর আগে রাত তিনটার দিকে, দুবৃত্তদের ছুরিকাঘাতে মার যায়। কে বা কারা, কেন তাকে খুন করেছে এখনও কেউ জানে না। তবে কি…………! যাই হোক, কিন্তু রাত ১২ টা থেকে রাত ৪ টা ৩০ মিনিট, এতটা সময় কোথায় ছিলাম আমি ?

Permanent link to this article: http://vabuk.com/2015/12/25/%e0%a6%85%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%ad%e0%a7%81%e0%a6%a4-%e0%a6%b8%e0%a7%87%e0%a6%87-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a7%87/

Dec 25

বৃষ্টি ভেজা চা

ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। রিকশাওয়ালা বলল, আপনের অসুখ হইয়া যাইবো। যে হারে কাপতাছেন, চাইর ঘন্টা তো হইল। আর কতো ? শইলে আর শইব না, বাদ দ্যেন।

আমি বললাম, তোমার রিকশা চালাইতে কষ্ট হলে তোমারে ছেড়ে দেই, তুমি যাওগা।

রিকশাওয়ালা – না তা কই নাই। আমাগো আর কি সমস্যা।

আমি বললাম, তোমাকে আমি একটা সাহায্য করতে পারি। তুমি চাইলে, রিকশার পিছে বসতে পার, আমি চালাই। তোমার ভাড়া আমি ঠিকই দিয়ে দিব।

রিকশাওয়ালা – না মামা এইডা হয় না। আর আপনি যে ভাবে কাপতাছেন, পারবেন না।

আমি বললাম, তাহলে কথা বলবা না, যেইদিকে মন চায় যেতে থাক। চা খাবে ?

রিকশাওয়ালা – না মামা, বৃষ্টির মদ্দে চা খামু না।

আমি বললাম, তুমি কি যান, বৃষ্টির পানি মিশানো চা খেতে কি মজা। থাক তুমি বুঝবা না। চায়ের দোকান পাইলে থামাবা।

রিকশাওয়ালা – মামা একটা কতা কমু ? রাগ কইরেন না আবার !

আমি বললম, রাগ করার মত হলে তো রাগ করবই। যদি মনে কর রাগ করব বইল না।

রিকশাওয়ালা – না মানে, আমার মনে হয়, আপনি ডিগবাজি খাইছেন।

আমি বললাম, কি!

রিকশাওয়ালা – বুঝলেন না। তয় থাক। আচ্ছা কন না মামা আপনের কি মন খারাপ?

আমি বললাম, না, তেমন না, তবে, থাক……

রিকশাওয়ালা – আমি মামা কতা বেশি কই। আমার বাজান কইতো, তোর কতার রেলগাড়ি থামাবি ? নাইলে কিনতুক কান কপাডির উপরে থাবরা খাবি। আমার বাপজান টা আমারে অনেক ভালবাসত। আমি অনেক বার অই থাবড়া খাওনের কতা শুনছি, কিন্তু একবার ও খাই নাই। মামা আমারে কন না আপনের কি হইছে ? আমি শান্তি পাইতেছিনা। কোন মাইয়া কি আপনারে ডিগবাজি দিছে ?

আমি বললাম, আরে না। আমারে ছ্যাক দিতে হইলে মেয়েদের ১০৩ বার জন্ম নিয়া আসতে হবে। আমি কাউরে পাত্তা দেই না।

রিকশাওয়ালা – মাইয়াডারে আপনি অনেক বেশি ভালোবাসতেন, তাই না মামা।

আমি বললাম, আরে না, তেমন কিছু না।

রিকশাওয়ালা – এই অবস্থায় সবাই একই রকম কতা কয় মামা। আপনি মাইন্ড খাইয়েন না। ওর চাইতে আরো ভাল মাইয়া পাইবেন।

আমি বললাম, ওই মিয়া তুমি আসলেই বেশি কথা বল। তোমার বাজানের মত আমার ও মন চাইতেছে, তোমারে ঠাডাইয়া একখান থাবড়া দেই, থামরে ভাই।

রিকশাওয়ালা – সরি।

আমি বললাম, আমি একজনকে কাল খুন করছি।

রিকশাওয়ালা – সরি মামা, আপনের কইতে মন না চাইলে কইয়েন না। আপনাগো মত টাইটুই পরা মানুষ গুলারে এই ভাবে ঘুরতে দেখলে ভাল লাগে না।

আমি বললাম, বললাম না একজন কে খুন করছি। তাই মনটা অনেক খারাপ। কিন্তু আমাকে কেউ খুনি বলবে না, বা শাস্তিও দিবে না। তাই নিজেকে মাফ করতে পারছি না।

রিকশাওয়ালা – থাক মামা, কওয়ন লাগব না। আমি শুনুম না। মিছা কতা কইয়েন না। আমি এইডারে অনেক ভয় পাই। একবার মিছা কতা কওনের লাইগা আমার দম বন হইয়া গেছিল। হের থেকে আমি মিছা কতারে অনেক ডরাই।

আমি বললাম, তুমি থাম, আমি বলি। আমি কাল আমার বৌ-রে মেরা ফেলছি।

রিকশাওয়ালা – কন কি মামা! কে কে জানে ?

আমি বললাম, সবাই জানে। কিন্তু কিছুই করার নাই। গতকাল সকালে অফিস আসার আগে নতুন সিলিং ফ্যান লাগায়া আসছিলাম। তারা হুরড়ার মধ্যে ঠিক মত নাট-বল্টু টাইট না দেয়ায় দুপুরের দিকে খুলে পড়ে মাথা ফেটে মারা গেছে। আজ সকালে দাফন হইছে।

রিকশাওয়ালা – কিছু খাইছেন মামা।

আমি বললাম, কালকে থেকে খাই নাই।

রিকশাওয়ালা – চলেন খাই। বৃষ্টির পানি মিশান চা খাই।

আমি, তোমার ভাবির সাথে টি…এস…সি-র মোড়ে অনেক দিন আমি এই চা খাইছি…………………!

Permanent link to this article: http://vabuk.com/2015/12/25/%e0%a6%ac%e0%a7%83%e0%a6%b7%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%ad%e0%a7%87%e0%a6%9c%e0%a6%be-%e0%a6%9a%e0%a6%be/

Dec 25

জাত লেখক

আমি লেখক হতে চাই। এই বাক্যটি নিজেকে অনেকবার বুঝিয়েছি। কিন্তু কেন যেন মন আমার কিছুতেই সায় দেয় না। সারাক্ষন বলে তুই পারবি না। তারপরও আমি জীবনে দুইবার লেখক হয়েছিলাম। হাসলেন, তাই না! এর মানে লেখালেখির ভাব ধরেছিলাম। আমার এক বন্ধু ছিল জাত লেখক। যেন লেখালেখির জন্যই তার জন্ম। সে যা লিখতে চায় তাই লিখে ফেলে। সেটা পড়ে মানুষ আবার হাসেও। আমার তখন গা জ্বালা করত। আমি কেন পারি না? তবে আমি লিখতে পারি অনেক কিছুই। গল্প, কবিতা, গান, উপন্যাস, নাটক – এমন কিছু নাই যা আমি লিখি নাই। তবে সবসময় তা মনে মনেই করেছি। কলম ধরলেই সেই সাজানো কথাগুলো যেন গুবলেট হয়ে যায়। আমার মনের বাসনা পূর্ণ করার জন্য, বন্ধুটি তার একটি লেখা আমার নামে চালিয়ে দেবার প্রস্তাবও দিয়েছিল। আপনিই বলুন, এই অপমান কি আমার মত মানুষ মেনে নিতে পারবে? মনের দুঃখে এ যাত্রায় লেখালেখিই ছেড়ে দিলাম।

দ্বিতীয় পর্বটি ছিল আরো ভয়ংকর। বন্ধুটি যখন পড়াশুনার জন্য দেশের বাইরে চলে গেল, ভাবলাম ফাঁকা মাঠে গোল দেবার এইতো সুযোগ। তার মত করে অনেক কিছু লিখলাম। কিন্তু একটিও পাঠানোর সাহস হল না কোথাও। ততদিনে লেখক ’সাকিব ফেরদৌস’-এর জায়গাটায় হয়ত অন্য কেউ দখল করে নিয়েছে ভেবে দ্বিতীয়বারের মত আমার লেখক সত্ত্বার মৃত্যু হয়। ওদিকে আমার বন্ধুটি তার লেখালেখি দিয়ে ব্লগে ব্লগে ঝড় তুলছে। কুড়ি-পঞ্চাশেক কমেন্টস্ নিত্য তার লেখার পিছে লেজুড় হয়ে ঝুলে থাকে। তবে এখন আমি আর এগুলো নিয়ে ভাবি না।

এখন আমি সুশীল মানব। আমি এখনও লিখি। কিন্তু গল্প, কবিতা বা উপন্যাস নয়। কম্পিউটার প্রোগ্রামের হাজার হাজার লাইন রচনা করা আমার নিত্য কর্ম। নিজের অজান্তাই আমি একজন আধুনিক লেখক। আমার বন্ধুটি আজ আমার লেখার ভাষা বুঝে না হয়তো। এটাও জানে না আজ ব্লগে তার লেখার গতি বাড়ে আমাদের মত লেখকদের ছোট ছোট রচনায়। এ রচনার রচইতাকে হয়তো কেউ চেনে না। কিন্তু আমাদের লেখার কল্যাণেই আজ ভার্চুয়াল জগতে তোমাদের এত সহজ বিচরন।

Permanent link to this article: http://vabuk.com/2015/12/25/%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a4-%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%96%e0%a6%95/